Print View

Your printed page will look something like this.

পরিচিতির ফাঁদে টিনটিন | পঞ্চম শ্রেণির ভাষা-প্রতিযোগিতা

নামসা  •  বিদ্যালয় ও প্রাক্তনীদের যৌথ উদ্যোগ  •  ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিচিতির ফাঁদে টিনটিন

তিন ঘরে পঞ্চম শ্রেণির ৬৮ ছাত্রের ভাষা-পরীক্ষা

প্রতিযোগিতা শেষে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছে ছাত্রেরা
প্রতিযোগিতা শেষ। উত্তরপত্র জমা দিয়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসছে ছাত্রেরা।

তিনটি শ্রেণিকক্ষে প্রায় একসঙ্গে কলম থামল। জমা পড়ল ৬৮টি উত্তরপত্র। কেউ স্বস্তির হাসি হাসল, কেউ শেষ মুহূর্তেও মনে মনে মিলিয়ে নিল কোনও বানান। কেউ হয়তো ঘর থেকে বেরিয়েই বুঝল—একটি উত্তর অন্য রকম হওয়া উচিত ছিল।

প্রতিযোগিতা শেষ। এ বার অপেক্ষা ফলের।

কিন্তু এই আয়োজনের উদ্দেশ্য শুধু কয়েক জন বিজয়ীকে খুঁজে বার করা নয়। ছাত্রেরা কী শিখেছে, কতটা মনে রেখেছে এবং প্রয়োজনের সময়ে সেই শিক্ষা কতটা প্রয়োগ করতে পারছে—তা বোঝারও একটি চেষ্টা।

সে দিক থেকে তিনটি ঘরে বসা প্রত্যেক ছাত্রই বিজয়ী। তারা অংশ নিয়েছে, ভেবেছে, নিজের শেখাকে যাচাই করেছে। কোথাও ভুল হলে সেখান থেকেও নতুন করে শেখার সুযোগ পেয়েছে।

তবু এটি যখন প্রতিযোগিতা, তখন স্থানাধিকারীদের নাম জানার কৌতূহল থাকবেই। সেই ফলাফলে পৌঁছনোর আগে ফিরে দেখা যাক, কী ভাবে একটি প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষের ভাষা-পরীক্ষা হয়ে উঠল।

তিনটি শ্রেণিকক্ষে বাংলা ও ইংরেজি ভাষার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রেরা
তিনটি শ্রেণিকক্ষে প্রতিযোগিতার বিভিন্ন মুহূর্ত। কোথাও উত্তর লেখায় মগ্ন ছাত্রেরা, কোথাও কঠিন প্রশ্নের সামনে থমকে ভাবার পালা।

একটি ভাবনা থেকে শুরু

কয়েক সপ্তাহ আগেও এই প্রতিযোগিতা ছিল শুধু একটি প্রস্তাব।

নামসার কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে জুনিয়র বিভাগের ছাত্রদের জন্য এ বছরও একটি প্রতিযোগিতা আয়োজনের প্রস্তাব প্রথম দিয়েছিলেন সমীর বিশ্বাস। আগের বছর ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তাই এ বার অন্য ধরনের কিছু করার কথা ওঠে।

একাডেমিক সাব-কমিটির আলোচনায় স্থির হয়, পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রদের জন্য বাংলা বানান ও হাতের লেখার প্রতিযোগিতা করা হবে। বিশ্বজিৎ বোস প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে জুনিয়র বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্যামলী মিত্রের সঙ্গে কথা বলেন। ঠিক হয় দিন, সময় এবং পরীক্ষার প্রাথমিক আয়োজন।

তখনও পরিকল্পনায় ছিল মূলত বাংলা। কিন্তু পূর্ববর্তী পরীক্ষা আয়োজনের অভিজ্ঞতা থেকে আলোচনায় আসে ইংরেজির কথাও। সুবিনীত রায়, বিশ্বজিৎ বোস এবং দীপঙ্কর ঘোষের আলোচনায় প্রতিযোগিতার পরিধি বাড়ে। বানান ও হাতের লেখার পাশাপাশি দুই ভাষার উপর ছাত্রদের দক্ষতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

প্রশ্নপত্র তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সুবিনীত রায়কে। শেষ পর্যন্ত তিনটি শ্রেণিকক্ষে পরীক্ষায় বসে ৬৮ জন ছাত্র।

বিদ্যালয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে

প্রাক্তনীদের পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুরু থেকেই পাশে ছিলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

দিন ও সময় স্থির করা, তিনটি শ্রেণিকক্ষ প্রস্তুত রাখা, ছাত্রদের অংশ নিতে উৎসাহ দেওয়া এবং প্রতিযোগিতার দিন গোটা ব্যবস্থা সচল রাখা—প্রতিটি পর্যায়ে বিদ্যালয় ও প্রাক্তনীরা একসঙ্গে কাজ করেছেন।

এই সহযোগিতা নতুন নয়। আগের বছরের ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার পর এ বার ভাষার দক্ষতা যাচাইয়ের আয়োজন সেই ধারাবাহিক কাজেরই পরবর্তী ধাপ। বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্রদের শেখার সুযোগ বাড়ানো এবং প্রয়োজনের জায়গাগুলি চিহ্নিত করাই এই যৌথ উদ্যোগের লক্ষ্য।

প্রাক্তনীদের সময়, অভিজ্ঞতা ও শ্রম এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সক্রিয় সহযোগিতা—দুইয়ের মিলনেই একটি প্রস্তাব শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতিযোগিতাটি তাই শুধু নামসার অনুষ্ঠান নয়; এটি বিদ্যালয় ও প্রাক্তনীদের যৌথ আয়োজন।

প্রতিযোগিতার জন্য শ্রেণিকক্ষের বাইরে সারিবদ্ধ ছাত্রেরা
প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে শ্রেণিকক্ষের পথে ছাত্রেরা।

তিন ঘরে কলমের লড়াই

গত ৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টায় শুরু হয় প্রতিযোগিতা। তিনটি ঘরে দায়িত্বে ছিলেন রঞ্জন সেন, সুবিনীত রায় এবং বিশ্বজিৎ বোস।

এক ঘণ্টার পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি বানানের পাশাপাশি ছিল দুই ভাষার উপর দক্ষতা যাচাইয়ের প্রশ্ন। দেখা হয় হাতের লেখা ও পরিচ্ছন্নতাও।

মোট ৮৫ নম্বরের মধ্যে বাংলার জন্য ছিল ৫৬, ইংরেজির জন্য ২৩ এবং হাতের লেখা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য ছয় নম্বর।

প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পরেই তিনটি ঘরের চেহারা বদলে যায়। কথাবার্তার জায়গা নেয় কলমের শব্দ। কেউ দ্রুত উত্তর লিখেছে। কেউ একটি বানান মনে করতে গিয়ে থেমেছে। কাউকে গালে হাত দিয়ে ভাবতে দেখা গিয়েছে, কেউ কান চুলকে স্মৃতি হাতড়েছে, কেউ আবার চার দিকে এক বার তাকিয়ে ফের মন দিয়েছে নিজের খাতায়।

প্রশ্ন কি খুব কঠিন?

পরীক্ষা চলাকালীন ছাত্রদের মুখ দেখে আয়োজকদের মধ্যেও সেই প্রশ্ন উঠেছিল। কয়েকটি বানান যে তাদের যথেষ্ট ভাবিয়েছে, তা বোঝা যাচ্ছিল। তবে উদ্দেশ্য কেবল সহজ প্রশ্নে বেশি নম্বর তোলানো ছিল না। ছাত্রেরা শেখা বিষয় কতটা মনে রেখেছে এবং নতুন পরিস্থিতিতে তা কতটা প্রয়োগ করতে পারছে, সেটিই ছিল আসল পরীক্ষা।

পরিচিতির ফাঁদ

সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে বাংলা বিভাগের শেষ প্রশ্নে। সেখানে কয়েক জন লেখকের নামের সঙ্গে তাঁদের সৃষ্ট চরিত্রের সঠিক নাম মেলাতে বলা হয়েছিল। লেখক পরিচিত, চরিত্রগুলিও পরিচিত। তবু সেই পরিচিতিই কয়েক জন ছাত্রকে ফেলল ফাঁদে।

তারা সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্ট চরিত্র হিসেবে লিখল—টিনটিন!

উত্তরটি প্রথমে পরীক্ষকদের হাসিয়েছে, পরে ভাবিয়েছে। সত্যজিৎ রায় পরিচিত। টিনটিনও পরিচিত। কিন্তু এক জনের সৃষ্ট চরিত্র অন্য জনের ঘরে গিয়ে বসেছে।

ভুলটি শুধু নম্বর কাটার কারণ হয়ে থাকেনি। ছাত্রদের পড়া, জানা এবং সেই জ্ঞানকে সঠিক সম্পর্কের মধ্যে সাজানোর জায়গায় কোথায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে, সেটিও দেখিয়েছে। সঠিক উত্তর যেমন আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, তেমনই একটি ভুল উত্তর দেখিয়ে দেয় পরের বার কী শিখতে হবে।

দুই জন প্রথম

উত্তরপত্র মূল্যায়নের পরে দেখা গেল, সর্বোচ্চ নম্বরে রয়েছে দুই ছাত্র।

যুগ্ম প্রথম
সৌম্য দাস রোল ২২  ও  সুরজিৎ নাথ রোল ১৭
৬৬/৮৫  •  ৭৭.৬%
দ্বিতীয় — অভ্র বোস রোল ২৯
৬৩/৮৫  •  ৭৪.১%
তৃতীয় — দেবাঞ্জন মান্না রোল ৩৬
৬০/৮৫  •  ৭০.৬%
চতুর্থ — শিবাংশু নাথ রোল ৪
৫৯.৫/৮৫  •  ৭০%

নম্বরের বাইরের ফল

৬৮ জন ছাত্রের মধ্যে ১৮ জন ৬০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর ২৬.৫ শতাংশ এই সীমা অতিক্রম করেছে। আবার ১৮ জনের নম্বর ৪০ শতাংশের নিচে। পাঁচ জন পেয়েছে ৩০ শতাংশের কম।

এই পরিসংখ্যান শুধু কে কত নম্বর পেল, তার হিসাব নয়। ছাত্রেরা কোন জায়গায় ভাল করছে এবং কোথায় আরও অনুশীলন ও সহায়তা প্রয়োজন, তারও একটি প্রাথমিক ছবি।

যারা স্থান পেয়েছে, তাদের কৃতিত্ব আলাদা করে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু যারা পরীক্ষায় বসেছে, কঠিন প্রশ্নের সামনে থেমে ভেবেছে এবং নিজের শেখা প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছে, তাদের অর্জনও কম নয়।

প্রতিযোগিতায় ক্রমতালিকা প্রয়োজন। শেখার ক্ষেত্রে তা শেষ কথা নয়।

নেপথ্যের দল

এই আয়োজনের দায়িত্বে ছিল নামসার Academic and Welfare Subcommittee।

তিনটি শ্রেণিকক্ষ পরিচালনার মূল দায়িত্বে ছিলেন রঞ্জন সেন, সুবিনীত রায় এবং বিশ্বজিৎ বোস। প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে যৌথ ভাবে কাজ করেছেন সুবিনীত রায় ও রঞ্জন সেন।

আয়োজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন অরুণাভ রায়চৌধুরী, শ্যামল ব্যানার্জী ও সমীর বিশ্বাস। নেপথ্য থেকে বিশেষ সহযোগিতা করেন ত্রিদেব মুখার্জী।

জুনিয়র বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত শ্যামলী মিত্র এবং তিনটি শ্রেণির দায়িত্বে থাকা শিক্ষিকারাও ছাত্রদের উৎসাহ দেওয়া থেকে শুরু করে প্রতিযোগিতা পরিচালনা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে পাশে ছিলেন।

এক দিকে বিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষিকারা, অন্য দিকে বহু বছর আগে এই বিদ্যালয় থেকেই বেরিয়ে যাওয়া ছাত্রেরা। মাঝখানে পঞ্চম শ্রেণির ৬৮ জন শিক্ষার্থী। তিনটি প্রজন্মকে একই শিক্ষার সূত্রে যুক্ত করল একটি প্রতিযোগিতা।

খাতা জমা পড়েছে। ফল প্রকাশিত হয়েছে। শেখার কাজটি এখনও চলছে।

New Alipore Multipurpose School Alumni Association · NAMSAA